মালদহের রেশম চাষের ইতিহাস ও বর্তমান সরকারের উদ্যোগ

দৈনিক জনকণ্ঠ, জুলফিকার আলি, মালদা: মালদহের রেশম শিল্পের অতীত গৌরব ও বর্তমান সংকটের ছবি বাংলা তথা ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে মালদহের রেশম শিল্পের সঙ্গে। প্রাচীন পুণ্ডবর্ধন ও গৌড়ের ঐতিহ্য থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক যুগ— মালদহের রেশমি সুতো ও বস্ত্রের গল্প কয়েক শতাব্দীর পুরনো। তবে প্রাচীন সমৃদ্ধি এবং রাজ্যের শীর্ষস্থান ধরে রাখা সত্ত্বেও আজ নানা প্রশাসনিক ও সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।
ইতিহাসের পাতায় মালদহের ‘পট্টবস্ত্র’ মালদহের রেশম চাষের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’-এ প্রাচীন পুণ্ডবর্ধনের মসৃণ ও কালো রঙের বিশেষ রেশমি কাপড়ের উল্লেখ রয়েছে, যা ‘পট্টবস্ত্র’ নামে পরিচিত ছিল। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের ‘ইম্পেরিয়াল গাজেটিয়ার’ অনুযায়ী, গৌড়ের শেষ হিন্দু রাজাদের আমলেই এই শিল্প চূড়ান্ত রূপ নেয়। ষোড়শ শতকের শেষভাগে শেখ ভিক নামক এক স্থানীয় ব্যবসায়ী এখান থেকে রেশমি কাপড় নিয়ে রাশিয়ায় বাণিজ্যের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন।
মোগল আমলে সম্রাট আকবরের সময়ে ‘আইন-ই-আকবরী’-তে মালদহ-কাশিমবাজার বেল্টের উচ্চমানের রেশমের প্রশংসা পাওয়া যায়। সুবে বাংলায় আকবরের স্থাপন করা রাজকীয় কারখানায় রাজপরিবারের জন্য বিশেষ সিল্ক তৈরি হতো। তৎকালীন সময়ে পুণ্ডা (পুণ্ডরিক) সম্প্রদায় এবং মুসলিম চাষিরা যৌথভাবে ঘরোয়া শিল্প হিসেবে তুঁত চাষ, পলু পালন ও সুতো কাটার কাজ চালাতেন। পরে ১৭শ শতকের মাঝামাঝি ডাচ ও ইংরেজ বণিকরা এই রেশমে আকৃষ্ট হয় এবং ১৬৮০ সালে ইংরেজরা মালদহে কুঠি স্থাপন করে। ১৭৭০-৭৫ সালের দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্থানীয় বয়ন শিল্পকে কোণঠাসা করে ইংল্যান্ডের মিলের জন্য কাঁচা রেশম রপ্তানিতে জোর দেয়, যার ফলে বহু স্থানীয় তাঁতি ও চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বর্তমান পরিস্থিতি ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েও মালদহ আজ পশ্চিমবঙ্গের রেশম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। সম্প্রতি মালদহের সিল্ক ‘জিআই ট্যাগ’ -ও অর্জন করেছে। বর্তমানে জেলার পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব পরিষ্কার বোঝা যায় তুঁত চাষের জমি প্রায় ২৩ হাজার একর, জড়িত রেশম চাষী পরিবার ৭০ হাজারেরও বেশি সরাসরি পলু পোকা পালনে যুক্ত, উৎপাদন বার্ষিক প্রায় ১,৫০০ মেট্রিক টন রেশম সুতো, কারখানা জেলায় প্রায় ৩,০০০টি ছোট ছোট সুতো তৈরির কারখানা রয়েছে, কর্মসংস্থান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল I রেশম চাষিদের ক্ষোভ এত বড় অর্থনৈতিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে রেশম শিল্পে কিছুটা ভাটা পড়েছে। নতুন প্রজন্ম বা যুবসমাজ এই মেহনতি পেশা থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
আলীনগর গ্রামের প্রগতিশীল রেশম চাষী সুফিয়ান আলির মতে, “আগে রেশম বিভাগ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের অধীনে থাকায় চাষিদের প্রভূত উন্নয়ন হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার একে কৃষি দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে রেশম বিভাগের গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চাষের ওপর।” অন্যদিকে, রেশম দপ্তরে বহু কর্মী অবসর নেওয়ার পর নতুন নিয়োগ না হওয়ায় কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রেও চাষিরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। মালদা সিল্ক ইয়ার্ন প্রডিউসার ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জ্বল সাহা জানান, “অবিলম্বে রেশম দপ্তরের শূন্যপদগুলো পূরণ করতে হবে এবং চলমান প্রকল্পগুলোতে উপভোক্তার সংখ্যা বাড়াতে হবে। তবেই আবার এই শিল্পে জোয়ার আসবে।” তিনি আরও জানান যে রেশম শিল্পের সার্বিক উন্নয়নের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে এবং এই বিভাগকে পুনরায় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প দপ্তরের অধীনে নিয়ে আসার প্রস্তাব দেওয়া হবে।
উন্নয়নের নতুন আশ্বাস বর্তমান শুভেন্দু অধিকারী সরকার মালদহ জেলায় রেশম চাষ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চলতি ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরে প্রশাসন জেলা জুড়ে ৩০০ একর নতুন জমিতে তুঁত গাছ লাগানো, ৬০০ জন চাষীকে ডালা ও চন্দ্রকী সহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম প্রদান, ১০০ জন চাষীকে পাম্প সেট ও শ্যালো বিতরণ এবং ১,৫০০ জন চাষীকে জীবাণুনাশক সরবরাহ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। রাজ্যে প্রথম স্থান ধরে রাখা মালদহের এই ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প সরকারি সঠিক নীতি ও প্রশাসনিক সহায়তার মাধ্যমে আবারও তার পুরানো মহিমা ফিরে পাবে— এমনটাই আশা করছেন জেলার লাখো রেশম চাষী ও কারিগররা।





























































































































