গলি থেকে রাজপথ-লামিনে ইয়ামালের উত্থানের গল্প দৈনিক জনকণ্ঠের পাতায়

মুহাম্মদ শাহবাজ:
ফুটবল মাঠ মানেই রূপকথার জন্মস্থান। আর সেই রূপকথাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে নিয়েছেন স্পেনের তরুণ বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই ইবানা। বয়স সবেমাত্র কিশোরের গণ্ডিতে, কিন্তু এর মধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের এমন কিছু মাইলফলক তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন, যা এর আগে কোনো খেলোয়াড় করতে পারেননি। প্রথম ফুটবলার হিসেবে টিনএজার বা কিশোর বয়সে একই সঙ্গে উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউরো) এবং ফিফা বিশ্বকাপ উভয় টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলার অবিস্মরণীয় রেকর্ড গড়লেন এই বার্সেলোনা তারকা।
আজকের বিশ্বজয়ী ইয়ামালের এই পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই স্পেনের বার্সেলোনার কাছে ছোট্ট শহর ইসলোসে জন্ম নেওয়া ইয়ামালের পরিবার বহু সংগ্রাম পেরিয়ে আজ এই অবস্থানে এসেছে। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কো থেকে এবং মা শিলা ইবানা বিষুবীয় গিনি থেকে স্পেনে অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন।
পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা সচ্ছল ছিল না। বাবা মুনির রং মিস্ত্রির কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতেন। কিন্তু ছেলের মধ্যে ফুটবল নামক জাদুকরী প্রতিভা দেখতে পেয়ে বাবা-মা শত কষ্টের মাঝেও ইয়ামালের ফুটবল যাত্রায় ছায়ার মতো পাশে থেকেছেন। ছোট্ট ইয়ামালকে মাত্র সাত বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে ভর্তি করানো হয়। সেখানে নিজের প্রতিভা আর কঠোর পরিশ্রমে দ্রুত বয়সভিত্তিক দলগুলো পেরিয়ে মূল দলে জায়গা করে নেন তিনি।
লামিনে ইয়ামালের জীবন যে কতটা অবিশ্বাস্য গল্পের মতো, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০০৭ সালের একটি ঘটনা। তখন শিশু ইয়ামালের বয়স মাত্র কয়েক মাস, ইউনিসেফের একটি দাতব্য ফটোশুটের অংশ হিসেবে তরুণ লিওনেল মেসি একরত্তি ইয়ামালকে পরম যত্নে কোলে নিয়ে স্নান করিয়েছিলেন।
কে জানত, প্রায় দুই দশক পর সেই শিশুই বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে নিজের শৈশবের আদর্শকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাবে! জীবন সত্যি কতটা অদ্ভুতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তা এই ছবিটির চেয়ে সুন্দরভাবে আর ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।
খুব অল্প বয়সেই বার্সেলোনার জার্সিতে মাঠে নেমে কম বয়সি গোলদাতা ও রেকর্ড গড়ার ইতিহাস গড়তে শুরু করেন ইয়ামাল। ক্লাবের হয়ে নজর কাড়ার পর ডাক পান স্পেনের জাতীয় দলে। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ১৯ বছরের কম বয়সে স্পেনের হয়ে মাঠে নেমে বাজিমাত করেন তিনি। ফাইনালে দুর্দান্ত পারফর্ম করে স্পেনকে ইউরো চ্যাম্পিয়ন করার নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকা রাখেন এই টিনএজার।
সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখেন ইয়ামাল। বার্সেলোনার এই উইঙ্গার পুরো টুর্নামেন্টে নিজের জাত চিনিয়ে স্পেনকে ফাইনালে তুলে নিয়ে যান।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের করা ঐতিহাসিক গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে স্পেন। শেষ বাঁশি বাজার পর যখন পুরো স্প্যানিশ দল উল্লাসে মেতে ওঠে, তখন সবার নজর কেড়ে নেন ইয়ামাল। সতীর্থদের উদ্দাম উদযাপনের ভিড়ে না গিয়ে তিনি সোজা হেঁটে যান মাঠের এক কোণে ভেঙে পড়া লিওনেল মেসির দিকে।
৩৯ বছর বয়সি মেসি তখন নিজের ষষ্ঠ ও ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের বেদনায় স্তব্ধ। ইয়ামাল তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে মেসি উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং ফিসফিস করে কিছুক্ষণ কথা বলেন। দুজনের কথোপকথন গোপনীয় থাকলেও, সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ফুটবল বিশ্ব একে দেখছে ‘এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে মশাল হস্তান্তরের’ সবচেয়ে নিখুঁত দৃশ্য হিসেবে।
ম্যাচ পরবর্তী সময়ে এই বিশেষ আলিঙ্গন নিয়ে সরাসরি মুখ না খুললেও, ফাইনালের আগে ইয়ামালকে নিয়ে মেসি তার গভীর মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন। মেসি বলেছিলেন, “ও বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। ওর সামনে অসাধারণ একটি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। তবে ফাইনালে আমরা চেষ্টা করব ও যেন সেরাটা খেলতে না পারে।” সঙ্গে ২০০৭ সালের সেই ভাইরাল ছবি প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেছিলেন, “ছবিটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। জীবন কত অদ্ভুতভাবে ঘুরে দাঁড়ায়।”
মরক্কো ও বিষুবীয় গিনির মিশ্র রক্ত, অভিবাসী পরিবারের দারিদ্র্যকে জয় করার অদম্য জেদ, বাবা মুনির ও মা শিলার ত্যাগ এবং শৈশবের লা মাসিয়ার কঠোর প্রশিক্ষণ সব মিলিয়ে লামিনে ইয়ামালের আজকের এই অবস্থান কেবল একটি সাফল্যের গল্প নয়, এটি এক নতুন রূপকথা। ফাইনালের ফলাফল স্পেনের পক্ষে গেলেও, জয়-পরাজয়ের সীমানা ছাড়িয়ে ইয়ামাল ও মেসির সেই আলিঙ্গন প্রমাণ করেছে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি ইতিহাস, আবেগ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা।



















































































































