মৃত্যু ও জানাযার মূল বার্তা

মাওলানা ফখরুল ইসলাম,নতুন পয়গাম: মৃত্যু মানে ক্ষণস্থায়ী জগৎ থেকে চিরস্থায়ী জগতে পাড়ি জমানো, যেখান থেকে কেউ কখনও ফিরে আসে না। মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষ তার প্রকৃত গন্তব্যের দিকে যাত্রা করে। তার এই যাত্রা ও গন্তব্য যেন সুখময় হয়, তার কিছুক্ষণের পৃথিবীর সঙ্গী ও স্বজনদের এই প্রার্থনা খুবই স্বাভাবিক।
একজন মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের যে কয়টি হক রয়েছে, তার অন্যতম হচ্ছে মৃত্যুর পর জানাযায় শরিক হওয়া এবং সম্ভব হলে দাফনকাজে অংশগ্রহণ করা। এ হক আদায়ের দ্বারা যেমন ইসলামী ভ্রাতৃত্বের পরিচয় দেওয়া হয়, তেমনি অনেক সওয়াব পাওয়া যায়।
যেকোনো স্বজনের মৃত্যুতে মানুষের চোখে অশ্রু ঝরে, প্রিয়জন ও আপনজনের বিয়োগব্যথা মানুষ সইতে পারে না। যে ভাইটি-বোনটি এত প্রিয় ছিল, উচ্ছ্বাস-উচ্ছলতায় সব শূন্যতা পূর্ণ করে রাখত, যে আব্বা-আম্মা এত আপন ছিলেন, মমতার শীতল ছায়ায় বেষ্টন করে রেখেছিলেন; যে পুত্র-কন্যা কলিজার টুকরা ছিল, যাদের দেখলে, যাদের কথা শুনলে প্রাণ জুড়িয়ে যেত; যে জীবনসঙ্গী ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়জন, যার সঙ্গ পৃথিবীর সব প্রতিকূলতা মোকাবিলার শক্তি জোগাত, হঠাৎ তার সকল বন্ধন ছিন্ন করা চিরবিদায়ের শোক কীভাবে মানুষ সইতে পারে; তাই মানুষের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে, তার হৃদয় বিদীর্ণ হতে চায়। এই সংকটের মুহূর্তেও ইসলাম থাকে মানুষের পাশে। ইসলামের নির্দেশনা মানুষকে শক্তি জোগায় সংযত থাকার।
এখানে আরেকটি দিক নিয়ে চিন্তা করা দরকার। মৃত্যু মানে শুধু পরপারে পাড়ি জমানো নয়, মৃত্যু মানে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। আজ যার মৃত্যু হল, এতদিন সে পৃথিবীতে স্বাধীন ছিল। যখন যা ইচ্ছা করার শক্তি ছিল, ন্যায়-অন্যায় সবকিছুর সমান ক্ষমতা ছিল। সে কি আল্লাহর পূর্ণ ফরমাবরদার ছিল, নাকি অনেক নাফরমানীও তার দ্বারা হয়েছে? প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে গুনাহর কাজ হয়েছে? আজ আল্লাহ তাকে ডাক দিয়েছেন হিসাবের জন্য। এ ডাকে সাড়া না দেওয়ার উপায় নেই। স্বজন-প্রিয়জনদের সাধ্য নেই, তাকে কোথাও লুকিয়ে রাখে।
আজ তাকে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। এখন তাকে কবরে নামানো হবে, ফেরেশতারা আসবে, তাকে প্রশ্ন করা হবে- তোমার রব কে, তোমার দ্বীন কী এবং যিনি তোমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন তিনি কে? তার গোটা জীবনের কর্মই হবে এসব প্রশ্নের জবাব। সে কি সারাজীবন ঈমানের ওপর ছিল? সুন্নতের ওপর ছিল? ইসলামের ফরয বিধান নামায, রোযা, হজ-যাকাত, পর্দা-পুশিদা, লেনদেন, সততা, অন্যের হক আদায় ইত্যাদি কি তার দ্বারা পালিত হয়েছে?
এখন আল্লাহ যদি নিজ ক্ষমা ও করুণার ছায়ায় তাকে আবৃত করেন, তবেই সে রক্ষা পাবে, অন্যথায় কী হবে তার অবস্থা? আল্লাহর ফয়সালা থেকে তো পালিয়ে যাওয়ার পথ নেই, মুক্তি পাওয়ার উপায় নেই, যতদিন না মালিক নিজ দয়ায় মুক্তি দান করেন।
সাহাবা-তাবেয়িন, সালাফে সালেহিন এবং সব যুগের খোদাভীরু ব্যক্তিরা যখন কোনো ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ শুনতেন, কারো জানাযায় শরিক হতেন, তখন তাদের সামনে এই দিকটিই বড় হত। সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের জন্য শিক্ষা নিতেন। কারণ, সবাই তো এ পথের পথিক, সবাইকে একদিন কর্মের জীবন শেষে প্রতিদানের জীবনে প্রবেশ করতে হবে। সবাইকে দাঁড়াতে হবে মহাবিচারের (কেয়ামত) কাঠগড়ায়। ব্যবধান শুধু এই যে, কারও ডাক আগে আসে, কারও ডাক পরে।
তাই তো দয়ার নবী আগে থেকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা রোগীদের দেখতে যাও এবং জানাযার পেছনে পেছনে গমন করো। এটা তোমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। (মুসনাদে আহমদ: ৩/২৩)।
সাহাবা-তাবেয়িন কোনো মৃতকে দেখলে, কারো জানাযায় শরিক হলে মৃত্যু ও মৃতের চিন্তা তাদের ওপর এমনই প্রভাব ফেলত যে, অনেকদিন পর্যন্ত তাদের চেহারায় তা দৃশ্যমান থাকত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো জানাযায় হাজির হতেন, তখন পেরেশানি ও বিষণ্ণতা তাকে আচ্ছন্ন করত এবং তিনি খুব বেশি চিন্তামগ্ন হয়ে যেতেন। (আল মুজামুল কাবির তাবারানি: ১১১)।
একবার হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) হযরত আলী (রা.) কে জানাযা সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। হযরত আলী (রা.) বললেন, আবু সাঈদ! যখন আপনি আপনার মুসলিম ভাইয়ের জানাযার সঙ্গে চলবেন, তখন নিশ্চুপ থাকুন এবং মনে মনে ভাবুন আপনার অবস্থাও তার মতো হয়েছে। সে ছিল আপনারই ভাই, যে আপনার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। আজ সে নিঃস্ব-বিপর্যস্ত হয়ে বিদায় নিয়েছে, নেক আমল ছাড়া আজ তার কোনো পুঁজি নেই। (মুসনাদে বাযযার: ৮৩৯)।
কিন্তু আমাদের অবস্থা এর বিপরীত। মৃতকে সামনে নিয়ে হইচই, তর্ক-বিতর্ক, গীবত-শেকায়েতেও লিপ্ত হয়ে পড়ি। অথচ আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য মৃত্যুর চেয়ে অধিক কার্যকরী আর কোনো বিষয় নেই। আল্লাহ আমাদের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে জীবন্ত করে দিন এবং তার খাঁটি বান্দাদের অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন।

































































































































